কাজী শামসুল হক

প্রকাশিত: ০২ আগষ্ট ২০২৬ , ০৪:৪১ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

জিব্রিলের ডানায় আসমানি পাখি

চব্বিশের জুলাই-আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে ঘিরে একটি নিবন্ধ

বাংলাদেশের আকাশে তখন সূর্য উঠত, কিন্তু আলো নামত না। নদীতে জোয়ার আসত, অথচ মানুষের রক্তে কোনো ঢেউ জাগত না। শহরের রাস্তায় মানুষের ভিড় ছিল, বাজারে কোলাহল ছিল, মসজিদে আজান ছিল, কিন্তু নাগরিকের কণ্ঠে স্বাধীনতার স্বর ছিল না। ভয় মানুষের ঘরে ঘরে ঢুকে পড়েছিল। ভয় বসেছিল খাবারের টেবিলে, অফিসের চেয়ারে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে, এমনকি শিশুর শোবার ঘরের পাশেও।

বছরের পর বছর রাষ্ট্রের ছায়ায় বেড়ে উঠেছিল গুমের গল্প, বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ, নির্যাতন, নির্বিচার গ্রেপ্তার, নজরদারি এবং মতপ্রকাশের ওপর অদৃশ্য শিকল। শাসনের বিরুদ্ধে কথা বললেই মানুষকে দেশদ্রোহী, ষড়যন্ত্রকারী কিংবা রাষ্ট্রের শত্রু বানানোর এক নির্মম সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন এবং বিরোধী কণ্ঠ দমনের বিস্তৃত অভিযোগ নথিবদ্ধ করেছে।  

মানুষ একসময় প্রতিবাদ করত। পরে ফিসফিস করে কথা বলত। তারপর কথা বলাও ভুলে গেল।

কেউ চাকরি বাঁচাতে চুপ থাকল, কেউ ব্যবসা রক্ষার জন্য নত হলো, কেউ সন্তানের নিরাপত্তার কথা ভেবে দরজা বন্ধ করল। কেউ সুবিধার লোভে বিবেক বিক্রি করল, কেউ অসহায় হতাশায় জুলুমকেই নিয়তি বলে মেনে নিল। মনে হচ্ছিল, এই অন্ধকারের কোনো শেষ নেই। এই রাতের পরে আর কোনো ভোর নেই।

কিন্তু ইতিহাসের বুকের গভীরে তখন অন্য এক ঘড়ি চলছিল।

২০২৪ সালের ৫ জুন সরকারি চাকরির কোটা নিয়ে হাইকোর্টের একটি রায়ের পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। জুলাইয়ের শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণেরা রাস্তায় নামে। তাদের হাতে অস্ত্র ছিল না। ছিল কয়েকটি দাবি, কিছু প্ল্যাকার্ড, কণ্ঠভরা স্লোগান এবং ভবিষ্যৎ হারানোর ভয়। আন্দোলনের প্রথম ভাষা ছিল বৈষম্য দূর করা, মেধার মূল্য প্রতিষ্ঠা করা, চাকরির ক্ষেত্রে ন্যায্যতা ফিরিয়ে আনা।  

ক্ষমতা তাদের ভাষা শুনল না। তাদের চোখের দিকে তাকাল না। বরং পুরোনো ঔদ্ধত্যে তরুণদের অবজ্ঞা করল, বিদ্রূপ করল, ভয় দেখাল।

১৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটল। ১৬ জুলাই রংপুরে বুক উন্মুক্ত করে দাঁড়িয়ে থাকা আবু সাঈদের শরীর গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেল। তার দুই হাত প্রসারিত ছিল। যেন সে একা দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রের বন্দুককে বলেছিল, গুলি করতে হলে করো, কিন্তু আমার প্রজন্ম আর মাথা নত করবে না।

আবু সাঈদ মাটিতে পড়ে গেলেন, কিন্তু সেই মুহূর্তে বাংলাদেশ উঠে দাঁড়াল।

তার নিথর শরীর থেকে যেন অদৃশ্য হাজার ডানা জন্ম নিল। স্কুলের কিশোর, কলেজের তরুণ, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, মাদ্রাসার সন্তান, শ্রমিক, রিকশাচালক, শিক্ষক, চিকিৎসক, শিল্পী, দোকানি, গৃহিণী, সবাই সেই ডানার নিচে এসে দাঁড়াল। জাতি বুঝতে পারল, এটি আর শুধু কোটার প্রশ্ন নয়। এটি জীবনের মর্যাদার প্রশ্ন। এটি রাষ্ট্রের মালিক কে, সেই প্রশ্ন।

১৮ জুলাই দেশজুড়ে ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করল। পর্দা অন্ধকার করে সত্যকে বন্দী করার চেষ্টা হলো। কারফিউ এল। সেনা মোতায়েন হলো। গুলি চলল। হাসপাতালের বারান্দা রক্তে ভিজল। অসংখ্য তরুণ আহত হলো, গ্রেপ্তার হলো, নিখোঁজ হলো। কিন্তু ইন্টারনেট বন্ধ করে মানুষের স্মৃতি বন্ধ করা গেল না। শব্দকে আটকে দেওয়া গেল, অথচ প্রতিবাদের স্পন্দন থামানো গেল না।  

মায়ের বুক তখন একই সঙ্গে ভয় ও গর্বে কাঁপছিল। কোনো মা সন্তানকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বলছিলেন, সাবধানে যাস। কোনো মা দুধের শিশুকে কোলে নিয়ে মিছিলে দাঁড়িয়েছেন। কোনো বধূ আন্দোলনকারীদের জন্য পানি, খাবার আর স্যালাইন নিয়ে ছুটেছেন। ঘরের মেয়েরা ঘর ছেড়ে রাজপথে এসেছে। তারা শুধু কারও বোন, স্ত্রী কিংবা মা হয়ে আসেনি। তারা এসেছে বাংলাদেশের পূর্ণ নাগরিক হয়ে।

আমি তাদের আবাবিল বলি না।

আমি বলি, তারা বাংলার আসমানি পাখি।

তারা কোনো অলৌকিক উপকথার পাখি নয়। তারা আমাদের ঘরের সন্তান। তাদের জন্ম মাটিতে, কিন্তু তাদের সাহস যেন আকাশ থেকে নেমে এসেছিল। মনে হচ্ছিল, জিব্রিলের বিশাল ডানার ছায়ায় তারা এগিয়ে যাচ্ছে। গুলির সামনে তাদের বুক কাঁপছে, তবু পা থামছে না। মৃত্যুর ভয় আছে, কিন্তু দাসত্বের ভয় তার চেয়েও বড়।

২১ জুলাই সর্বোচ্চ আদালত অধিকাংশ কোটা বাতিল করে সরকারি চাকরির ৯৩ শতাংশ মেধার ভিত্তিতে রাখার নির্দেশ দিল। কিন্তু তত দিনে আন্দোলনের নদী তার পুরোনো তীর অতিক্রম করেছে। কোটা সংস্কারের দাবি পূরণের মধ্যেই আর তাকে ফেরানো গেল না। নিহতদের রক্ত, আহতদের আর্তনাদ, নির্বিচার গ্রেপ্তার এবং অপমান আন্দোলনকে ন্যায়বিচারের দাবিতে রূপান্তরিত করেছিল।  

তরুণেরা বলল, শুধু কোটা নয়, হত্যার বিচার চাই। শুধু চাকরি নয়, মানুষের অধিকার চাই। শুধু একটি আদেশের পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রের চরিত্রের পরিবর্তন চাই।

৩ আগস্ট ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মানুষের সমুদ্র জমল। অসংখ্য কণ্ঠ মিলিত হয়ে এক দফায় এসে দাঁড়াল। সরকারের পদত্যাগ। ৪ আগস্ট অসহযোগ কর্মসূচিতে দেশ আবার রক্তাক্ত হলো। একদিকে নিরস্ত্র মানুষের ঢল, অন্যদিকে অস্ত্র, গুলি ও ক্ষমতার শেষ উন্মত্ততা। সেদিনের সংঘর্ষে প্রায় একশ মানুষের মৃত্যুর খবর আসে। কিন্তু রক্ত যত ঝরল, মানুষের ঢল তত বাড়ল।  

তারপর এলো ৫ আগস্ট।

ক্যালেন্ডারে সেটি আগস্টের পঞ্চম দিন। কিন্তু ইতিহাস ক্যালেন্ডারের কাছে আত্মসমর্পণ করল না। জুলাইয়ের অসমাপ্ত হিসাব নিয়ে দিনটি নিজের নতুন নাম লিখল, ছত্রিশে জুলাই, থার্টি সিক্স জুলাই।

সেদিন কারফিউ অমান্য করে জনতা ঢাকার দিকে এগিয়ে এল। কোনো বাঁধ তাদের থামাতে পারল না। গ্রাম থেকে শহর, গলি থেকে মহাসড়ক, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শ্রমজীবী জনপদ, সব পথ যেন একটি মোহনায় এসে মিলল। দুপুরের দিকে সংবাদ এল, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন এবং দেশ ছেড়ে ভারতে চলে গেছেন। সেনাপ্রধান অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ঘোষণা দিলেন। পনেরো বছরের অধিক সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা একটি সরকারের পতন ঘটল ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে।  

মানুষ রাস্তায় নেমে কাঁদল। কেউ সিজদায় পড়ে গেল। কেউ জাতীয় পতাকা জড়িয়ে ধরল। কেউ শহীদের ছবি বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আনন্দের ভেতরে শোক ছিল, বিজয়ের ভেতরে শূন্যতা ছিল। কারণ স্বাধীনতার নতুন সূর্য উঠলেও বহু মা তার সন্তানকে আর ফিরে পাননি।

জাতিসংঘের পরবর্তী অনুসন্ধান বলেছে, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে সংঘাত ও দমন-পীড়নে সর্বোচ্চ প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন। নিহতদের প্রায় ১২ থেকে ১৩ শতাংশ ছিল শিশু। জাতিসংঘের অনুসন্ধানে সাবেক সরকার, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা এবং ক্ষমতাসীন দলের সহিংস অংশের মাধ্যমে আন্দোলন দমনে পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত নির্যাতনের যুক্তিসংগত ভিত্তি পাওয়া গেছে।  

এই সংখ্যাগুলো শুধু সংখ্যা নয়। প্রতিটি সংখ্যার একটি নাম আছে। একটি মুখ আছে। একটি মা আছে। একটি অসমাপ্ত বই, একটি খালি বিছানা, একটি রেখে যাওয়া স্যান্ডেল, একটি রক্তমাখা জামা আছে।

চব্বিশের বিজয় তাই শুধু একটি সরকারের পতনের দিন নয়। এটি ভয়ের বিরুদ্ধে মানুষের বিজয়। এটি প্রমাণ করেছে, মানুষকে কিছুদিন নীরব করা যায়, কিন্তু চিরদিন পরাজিত করে রাখা যায় না। বন্দুক দিয়ে মিছিল ছত্রভঙ্গ করা যায়, কিন্তু ন্যায়ের আকাঙ্ক্ষাকে হত্যা করা যায় না। ইন্টারনেট বন্ধ করা যায়, কিন্তু বিবেকের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা যায় না।

তবে আসমানি পাখিদের বিজয় কেবল আনন্দের অধিকার দেয়নি, দায়িত্বও দিয়েছে। প্রতিশোধের বদলে বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ব্যক্তিপূজার বদলে প্রতিষ্ঠান গড়তে হবে। একটি স্বৈরশাসকের পতনের পরে আরেক স্বৈরশাসকের জন্ম হতে দেওয়া যাবে না। যে তরুণেরা বুকের রক্ত দিয়ে রাষ্ট্রকে মুক্ত করেছে, তাদের স্বপ্নকে দলীয় লোভ, দুর্নীতি ও ক্ষমতার নতুন বন্দিশালায় আটকে দেওয়া হবে সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা।

ছত্রিশে জুলাইয়ের আসমানি পাখিরা আমাদের শিখিয়েছে, কখনো কখনো আকাশ থেকে পাখি নামে না, মাটির সন্তানেরাই ডানা মেলে আকাশ হয়ে যায়।

তারা এসেছিল জিব্রিলের ডানার মতো বিশাল সাহস নিয়ে।

তারা গুলির সামনে দাঁড়িয়েছিল।

তারা অন্ধকারের দরজা ভেঙেছিল।

আর তাদের রক্তের অক্ষরে বাংলাদেশ আবার লিখেছিল তার বহুদিনের বিস্মৃত শব্দটি,

আজাদী, লড়াই করে পেয়েছি আজাদী।